fbpx

কাশ্মির যেতে চান? কেমন খরচ? জেনে নিন…

কাশ্মির ভ্রমণের স্বপ্ন অনেক আগে থেকেই ছিল। ঘুরে আসার পর পণ করেছি শীতকালে আবার যাব। বিমান টিকিট ২৫ দিন আগে করার কারণে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সে রাউন্ড ট্রিপ পেয়েছিলাম জনপ্রতি ১২,২০০ টাকা। তবে টিকিট কমপক্ষে ১-২ মাস আগে করলে ভালো হয়।

কারণ তখন অনেক কম টাকায় টিকিট পাওয়া যায়। ভিস্তারা, জেট এয়ারওয়েজের সার্ভিস অনেক ভালো। টিকিটের সঙ্গে ফ্রি খাবার থাকে। স্পাইসজেট, ইন্ডিগো, এয়ার এশিয়া বাজেট এয়ারলাইনস।

কাশ্মিরে গাড়ি আগে থেকেই ঠিক করে গিয়েছিলাম পরিচিত একজনের মাধ্যমে। প্রতিদিন ২,২০০ রুপি বিমানবন্দর থেকে। ছয় সিটের টয়োটা ইনোভা। কাশ্মিরে দেখার মতো অনেক জায়গা আছে।

তাই কমপক্ষে হাতে ৫ দিন সময় রাখা ভালো। শহরের বাইরে রয়েছে গুলমার্গ, সোনমার্গ, প্যাহেলগাম, দুধপাত্রী। আর শহরের ভেতরে ডাল লেক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, টিউলিপ গার্ডেন, নিশাত ও শালিমার গার্ডেন, হযরত বাল মসজিদ।

কিন্তু এসবের বাইরে দুধপত্রী, কোকরনাগ, উলারলেক, মানসবাল, ডাকসুম কিংবা সিনথেনটপের সৌন্দর্য আসলে আরো মুগ্ধকর। আহারবালের জলপ্রপাতটিও অনন্য এক স্থান। আর শিক্ষিত, সচেতন মানুষকে অবশ্যই বলব, কাশ্মির ইউনিভার্সিটি না দেখে ফিরবেন না।

কলকাতা থেকে সকাল সাড়ে নয়টার ফ্লাইট ভায়া দিল্লি। পৌঁছলাম সাড়ে ৪টা নাগাদ। শ্রীনগর এয়ারপোর্টে ড্রাইভার তারিক সফি ভাই (গাড়ির মালিক নিজেই। যথেষ্ট ভালো মানুষ। পাঁচ দিন তার সিম ছিল আমার কাছে) আমাদের জন্য প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন স্বাগতম জানানোর জন্য।

যা হোক, সেদিনই আমরা শ্রীনগর থেকে প্রায় ৯০ কি.মি দূরে পেহেলগামে চলে গেলাম। ভাগ্যক্রমে আমরা পেহেলগাম ভ্যালির সাথেই একটি রিসোর্ট পেয়ে গেলাম। প্রতি রুম ৫০০ রুপি।

পরদিন সকালেই ৮টার মধ্যে রওনা দিলাম মিনি সুইজারল্যান্ড খ্যাত বাইসরানের উদ্দেশ্যে। এখানে যেতে হবে ঘোড়ায় ট্র্যাকিং করে। যাওয়ার পথটা কোনভাবেই মসৃণ নয়। পাহাড়ি দুর্গম পথ।

এজন্য পায়ে হেটে ট্র্যাক না করাই ভালো। স্থানীয়রা এটাকে পনির রাইড বলে। জনপ্রতি ৭০০ রুপি। চাইবে অনেক কিন্তু অবশ্যই দর কষাকষি করে নিবেন। পথিমধ্যেই পড়বে প্যাহেলগাম ভ্যালি, কানমার্গ, কাশ্মির ভ্যালি, ওয়াটারফল, বজরঙ্গী ভাইজানখ্যাত মুন্নীর বাড়ি ডাবইয়ান।

ঘণ্টাখানেক ঘন পাইন বনের ভেতর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ার পর বাইসারন চলে এলাম। গভীর পাহাড়ের মধ্যে বিশাল সমতল জায়গা। সবার ভালো লাগলো ঘোড়ায় চড়া এবং পাইনের জঙ্গল। ঘুরে আসার পর মনে হবে, ৭০০ রুপি অনেক কমই দেওয়া হচ্ছে ঘোড়াওয়ালাদের পরিশ্রমের তুলনায়।

একটার মধ্যে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার গাড়ি ঠিক করতে হলো অরু ভ্যালি এবং বেতাব ভ্যালি যাওয়ার জন্য। কারণ কাশ্মিরের কোন গাড়ি এখানে চলতে দেওয়া হয় না। লোকাল গাড়ি নিতে হবে ছয় আসনের। ট্যাক্সি ইউনিয়ন আছে, সেখান থেকে ভাড়া করতে হয়। ভাড়া নেবে ১,২৫০ রুপি। অনেক সুন্দর রাস্তা দুই ভ্যালিতে যেতে। ঘুরে দেখতে পারেন হিন্দি ছবির অনেক শুটিংস্পট।

পথে একটি ভিউ পয়েন্টে কিছুক্ষণ ছিলাম ছবি তোলার জন্য। কিছু কাশ্মিরের যুবক বাংলাদেশি পরিচয় পেয়ে একদম জড়িয়ে ধরেছিল। অসম্ভব ভালো লেগেছে তাদের ব্যবহার। অরু ভ্যালিতে মিল্কিওয়ে নামে একটি হোটেল আছে।

বেশ সুন্দর হোটেল। আমি বলবো এখানে একদিন থাকার জন্য। কারণ চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ওইদিনই আমরা শ্রীনগর চলে আসি। ছিলাম ডাল লেকের ৮ নম্বর গেটের কাছে একটি হোটেলে। ভাড়া ৭০০ রুপি প্রতিরাতে।

৩য় দিন ভোরে নাস্তা করে বেরিয়ে পড়লাম সোনমার্গের উদ্দেশ্যে। এখানে এসে পনির রাইডে থাজিওয়াস গ্লেসিয়ারে গিয়ে বরফ দেখতে পারবেন। অথবা জিরো পয়েন্টে যেতে পারেন বরফ দেখার জন্য, যা সারা বছর থাকে।

তবে আমি বলবো গাড়িতে করে জজিলা পাস হয়ে জিরো পয়েন্ট যেতে। সোনমার্গ থেকে কারগিল ওয়ার মেমোরিয়াল পর্যন্ত ছয় আসনের গাড়ি ভাড়া ৬,২০০ রুপি।

যথারীতি দরদাম করতে ভুলবেন না। নাহলে ধরা খাবেন। একদম কারগিল ওয়ার মেমোরিয়াল পর্যন্ত গিয়েছিলাম লেহ-লাদাখ হাইওয়ে দিয়ে জজিলা পাস হয়ে। অসম্ভব সুন্দর জায়গা।

জজিলা পাস অন্যতম সুউচ্চ ভয়ংকর রাস্তার একটি। খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হয়, পাথুরে আঁকাবাঁকা রাস্তা। জিরো পয়েন্টে গেলে অবশ্যই গরম জ্যাকেট, কানটুপি, মাফলার, হাতমোজা নিয়ে যাবেন। তাপমাত্রা সবসময় জিরো থাকে এখানে।

আর কাশ্মির আসলে বারো মাসই সুন্দর। একেক সিজনের সৌন্দর্য একেক রকম। আমাকে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিল এসময়ে কাশ্মির না যাওয়ার জন্য। বরফ থাকবে না, অনেক গরম- আরও কত কী!

তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, কাশ্মির আসলেই পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ। গ্রীষ্মকালে শ্রীনগরে আবহাওয়া একটু গরম থাকে। বাকি ট্যুরিস্ট স্পটগুলোর আবহাওয়া উপভোগ করার মতো।

তবে শীতে কাশ্মির ভ্রমণ করতে হলে আপনাকে রাখতে হবে বাড়তি প্রস্তুতি। গরম কাপড়, গ্লাভস, বুট সেখানে আবশ্যক। যারা স্থলপথে যেতে চান, সেক্ষেত্রে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। কারণ মধ্যপথে রাস্তা বন্ধ হলে আপনাকে ফিরে আসতে হতে পারে।

৪র্থ দিন যথারীতি সকালের নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম শ্রীনগর থেকে ৫২ কি.মি দূরে গুলমার্গের উদ্দেশ্যে। মাঝপথে রাস্তার ধারে চোখে পড়বে সারি সারি আপেল বাগান। আর এখন তো আপেলের মৌসুম। আপেল ছুঁয়ে দেখার সেই লোভনীয় স্বাদ কি আর অপূর্ণ রাখা যায়! তবে ভুলেও গাছ থেকে আপেল পারার চেষ্টা করবেন না।

দেখতে দেখতে টানমার্গ পেরিয়ে গুলমার্গের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। যতই পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে উপরে উঠছি, সারি সারি পাইনগাছ আর ছোট ফুলগাছ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। দেখতে দেখতে গুলমার্গে পৌঁছে গেলাম।

গাড়ি থেকে নেমেই চারপাশটা দেখে নিলাম। কী অসাধারণ দেখতে। কোনো জায়গার সাথে কোনো জায়গার মিল নেই। একেক জায়গার সৌন্দর্য একেক রকম।

গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই দালালরা ঘিরে ধরবে পনির বা ঘোড়া রাইডের জন্য। ভদ্রভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়াই ভালো। চাইলে হেঁটেই প্রায় এক কি.মি দূরে কেবল কার রাইডের জন্য যেতে পারেন। তার আগেই বেশকিছু স্পট আছে যা হেঁটেই ঘুরতে পারবেন। আমরা পনির রাইড নিয়েছিলাম জনপ্রতি ৬০০ রুপি।

গুলমার্গও সারাবছর বরফ দেখার জন্য বিখ্যাত। এখানে দুই ধাপের কেবল কার বা রোপ ওয়ে আছে। নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে গেলে প্রথম ধাপে উঠলেই বরফ পাওয়া যায়। আর বাকি সময়ে গেলে দ্বিতীয় ধাপে বরফ পাওয়া যায়। তবে দ্বিতীয় ধাপে না গেলে অনেক কিছুই মিস করবেন। প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ ফিট উপরে মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া যায়।

আর গরম কাপড় নিতে ভুলবেন না, অনেক ঠান্ডা সেখানে। দ্বিতীয় ধাপ পর্যন্ত কেবল কারের ভাড়া নিবে জনপ্রতি ১,৭৯০ রুপি। টিকিট করতে গেলে দালালরা গাইড নেওয়ার জন্য খুব চাপাচাপি করবে, ভদ্রভাবে এড়িয়ে যাবেন।

গুলমার্গে আরও দেখবেন স্থানীয়রা পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসে। খুব ভালো লাগে মাঠে বসে যখন একসাথে খাবার খায় তারা। আমরা এরকম এক পরিবারের ছবি তুলতে চাইলে জিজ্ঞেস করল, ‘আপলোগ কাহাকে রেহনেবালি হো?’ তখন বাংলাদেশি মুসলিম পরিচয় দিতেই জোর করে খাইয়ে ছাড়বে এরকম জিদ করে বসল। যা হোক, কোনমতে রক্ষা পেলাম। মনে মনে চিন্তা করলাম, কাশ্মিরী বিরিয়ানিটা টেস্ট করতে পারলে মন্দ হতো না।

সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে এলাম শ্রীনগরে। বিফ খাওয়ার ইচ্ছা চরমভাবে তাড়া করছিল কাশ্মিরে যাওয়ার পর থেকেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, এখানে সবাই ভেড়ার মাংস খায়। ড্রাইভার তারিক ভাইকে বলতেই আমাদের নিয়ে গেল হযরত বাল মসজিদের কাছেই একটি ছোট রেস্টুরেন্টে। সেখানে বিফ শিক কাবাব মিলবে। এখানে ২৫ রুপি প্রতি শিক। অসাধারণ টেস্ট।

শেষদিনটি আমরা সিটি ট্যুরের জন্য বরাদ্দ রেখেছিলাম। সকালে উঠতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল এই ভেবে যে, বিকেলের ফ্লাইটে ফিরতে হবে। মন খারাপ করে আর কী হবে, ফিরতে তো হবেই। দিন শুরু হলো ডাললেকে শিকারা রাইড দিয়ে। ২ ঘণ্টা জনপ্রতি ২০০ রুপি। শিকারা রাইড শেষে দুপুরের মধ্যেই শালিমার গার্ডেন, পরিমহল, নিশাত গার্ডেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেন ঘোরা শেষ।

গার্ডেনগুলো মুঘল আমলের দৃষ্টিনন্দন ফুলে শোভিত। এবার ফেরার পালা। চেষ্টা করলাম কমপক্ষে ৩ ঘণ্টা আগে শ্রীনগর এয়ারপোর্টে পৌঁছতে। কারণ জ্যাম থাকে আর মাল্টিপল সিকিউরিটি চেক আছে এয়ারপোর্টে ঢোকার আগে এবং পরে। যা বেশ সময়সাপেক্ষ।

যদি হাতে সময় থাকে যাতায়াতের জন্য শেয়ারিং জীপ, মিনিবাস বা অটো ব্যবহার করতে পারেন। এতে যাতায়াত খরচ দশ ভাগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি লোকাল কাশ্মিরীদের সান্নিধ্য পাবেন। গুলমার্গ কমখরচে যেতে চাইলে চলে যাবেন পারিমপুরা বাসস্ট্যান্ডে।

সেখান থেকে শেয়ারিং জীপে ট্যানমার্গ জনপ্রতি ৭০ রুপি। সেখান থেকে আবার শেয়ারিং জীপে ৪০ রুপিতে গুলমার্গ। এই শেয়ারিং জীপ আমাদের দেশের মিনিবাসের মতোই সহজলভ্য। গাড়ি রিজার্ভ নিলে খরচ হতো ১,৮০০-২,০০০ রুপি। তাই মনে রাখতে হবে বাসস্ট্যান্ডের নামগুলো। অনন্তনাগ নামে আরেকটা বাসস্ট্যান্ড আছে। যেখান থেকে খুবই কমখরচে পেহেলগাম যেতে পারবেন।

আমরা ৫ জনের গ্রুপ করেছিলাম। খরচ পড়েছিল জনপ্রতি ৩০ হাজার ২০০ টাকা। ঢাকা টু কলকাতা বাসে, কলকাতা-শ্রীনগর ও কাশ্মীর-কলকাতা বিমানে, কলকাতা টু ঢাকা বিমানে যেতে পারেন।

কাশ্মির পর্যটন এলাকা। এখানে সবকিছুর দাম বেশি চাইবে। তাই যা-ই করুন না কেন, দরদাম করতে ভুলবেন না। তবে ভদ্রভাবে কথা বলবেন অবশ্যই। এখানকার খাবারে মসলা বেশি থাকায় বাংলাদেশিরা খেতে সমস্যা হয়।

ভাতের দামও অনেক বেশি। তাই রুটি খেলে খরচ কম হবে এবং খাওয়াও যাবে। বাংলাদেশের মতো রান্না গরুর মাংস খেতে চাইলে মুসলিম রেস্টুরেন্টে বলতে হবে ‘রাগনজোস’।

ডাললেকের ২ নম্বর গেটের সাথে একটু ভেতরে ঢুকলেই বাঙালি হোটেল পাবেন। মেদিনীপুরের কার্তিক বাবুর হোটেল। একদম বাংলা খাবারের স্বাদ পাবেন। মাছ, ভাত, ডাল, সবজি থালি ১৫০ রুপি।

সকালে প্লেন পরোটা অমলেট সবই পাবেন। রাত ৮টার পর হোটেলের বাইরে অযথা ঘোরাফেরা করবেন না। কেনাকাটা করতে চাইলে রাত ৮টার মধ্যেই শেষ করুন। কারণ রাত ৮-৯টার পর দোকান বন্ধ হয়ে যায়।

কাশ্মির মুসলিম প্রধান। তাই মুসলিম পরিচয় দিলে সুবিধা পাবেন। তবে তারা বাংলাদেশিদের খুব পছন্দ করে। কাশ্মির যতই যুদ্ধ আর সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা হোক না কেন, ট্যুরিস্টদের জন্য শতভাগ নিরাপদ।

কারণ এটাই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। তবে জেনেবুঝে কোনো বেশি সাহসী কাজ না করাই ভালো। যেমন কারো সঙ্গে মনোমালিন্য, দরদাম নিয়ে বেশি ঝামেলা করা, মাথা গরম করে কোনো কিছু করে না ফেলা।

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE