fbpx

তারেক জিয়া বিএনপির সম্পদ নাকি দায়!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি যে কৌশল অবলম্বন করেছিল সে কৌশল ভেস্তে দিল তারেক জিয়া নিজেই। বিএনপির মূল কৌশলই ছিল তারেক জিয়াকে আড়াল করে ড. কামাল হোসেনকে সামনে আনা।

এই কৌশল অবলম্বনের লক্ষ্যই ছিল গত ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, হাওয়া ভবনের দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং, সিএনজি দুর্নীতিসহ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মতো যে অপকর্মগুলো তারা করেছিল সেগুলোকে আড়াল করা। এজন্যই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সামনে এনেছিল তারা।

এক্ষেত্রে, ড. কামাল হোসেনের কাছে ধরনা দিয়ে তাঁর হাতেই নেতৃত্ব তুলে দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের স্বরূপে ফিরলেন তারেক। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকারে ভিডিও কনফারেন্সে তারেক জিয়ার উপস্থিতির মাধ্যমেই তারেক জানান দিলেন যে বিএনপির সর্বেসর্বা তিনিই। হঠাৎ করেই তারেকের এমন একচেটিয়া প্রভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে খোদ বিএনপির মধ্যেই।

বিএনপির একাংশ মনে করছে, তারেক জিয়ার এমন অংশগ্রহণে বিএনপির তৃণমূলের নেতারা উৎসাহ-উদ্দীপনা পাবে, সেইসঙ্গে খুঁজে পাবে আস্থার জায়গা। আবার বিএনপির একটি বড় অংশ মনে করছে, তারেক জিয়ার এমন অংশগ্রহণের ফলে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের যে ছক এঁকেছিল, তারেককে আড়াল করে শুধুমাত্র সরকারকে আক্রমণ করা নির্বাচনী কৌশল সাজানো তা পুরোপুরিই ব্যর্থতার রূপ নিল। এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন হলো, বিএনপির জন্য তারেক জিয়া সম্পদ নাকি দায়!

এভাবে জানান দিয়ে তারেক জিয়ার নেতৃত্ব গ্রহণে বিএনপির জন্য কিছু ইতিবাচক ফল আনবে।

প্রথমত, তারেক জিয়ার নেতৃত্ব গ্রহণে বিএনপির তৃণমূলের নেতারা ভাবছে জিয়া পরিবারের হাতেই বিএনপির নেতৃত্ব রয়েছে। এতে জিয়া পরিবারের যে সমর্থক গোষ্ঠী আছে, তারা নির্বাচনের মাঠে সরব হবে।

দ্বিতীয়ত, বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে কোন্দল ছিল আগে থেকেই। এখন, তারেক জিয়া প্রকাশ্যে আসার ফলে নির্বাচনের আগে নেতাদের কোন্দলে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেল বিএনপি।

তৃতীয়ত, দীর্ঘ ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে অর্থ সংকটে ভুগছে বিএনপি। নির্বাচনের আগে তারেকের এমন হস্তক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে পাবে দলটি।

চতুর্থত, তারেক জিয়া দলের বাইরে খুবই বিতর্কিত। তাকে বাংলাদেশের দুর্নীতির বরপুত্র বলা হয়। জনসাধারণের কাছে তারেক একটি বিতর্কিত চরিত্র। কিন্তু বিএনপির অনেক তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা পছন্দ করেন তারেককে। দলের তরুণদের মধ্যে তারেকের জনপ্রিয়তা বিপুল। এই তরুণরা তারেকের পক্ষে নির্বাচনের মাঠে কাজ করবে।

পঞ্চমত, মনোনয়নের প্রার্থী বাছাইকাজে তারেক যদি অংশগ্রহণ না করতেন, তবে মনে করা হতো, মনোনয়ন বোর্ডের বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা মনোনয়ন বাণিজ্য করবেন।

মনোনয়ন লাভের দৌড়ে অযোগ্য ও ব্যবসায়ী প্রার্থীরা এগিয়ে থাকবেন বলে বিএনপির মধ্যে কানাঘুষা চলছিল। কিন্তু, মনোনয়নের ক্ষেত্রে তারেক জিয়ার একচেটিয়া প্রভাবের ফলে বিএনপির অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের আর কোনো অভিযোগ আসবে না।

অন্যদিকে তারেকের নেতৃত্বে আসার ফলে অনেকগুলো ক্ষতির মুখোমুখি হবে বিএনপি।

প্রথমত, গত ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির অনিয়ম ও দুর্নীতিগুলো ভুলতে বসেছিল সাধারণ জনগণ। আওয়ামী-বিএনপি ব্যতীত বাংলাদেশে বিপুল ভোটার রয়েছে। এরাই নির্বাচনের নিয়ামক গোষ্ঠী। ঐক্যফ্রন্টের সুন্দর সুন্দর কথায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন তারা। কিন্তু নির্বাচনের আগেই তারেকের এমন প্রভাবে এটা পরিষ্কার বিএনপি যদি নির্বাচনে জয়লাভ করে তবে তারেকই নেতা হবেন দলটির। আবার জন্ম নিবে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ। কাজেই, নিরপেক্ষ ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিবে বিএনপি থেকে। যা বিএনপির জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে।

দ্বিতীয়ত, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর ফ্রন্টের নেতারা অনেক গালভরা কথা বলেছিলেন। সুশাসন, ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিহিংসার রাজনীতি বর্জনের পাশাপাশি উত্তরাধিকার রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন তারা। কিন্তু, হঠাৎ তারেকের এমন সামনে আসার ফলে, ঐক্য ফ্রন্টের নেতাদের এসব বক্তব্য যে ফাঁকা বুলি তা এখন জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট।

তৃতীয়ত, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, আ. স. ম. আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না ঐক্য ফ্রন্ট গঠনের পর থেকেই তাদের বক্তব্যে বারবার বলেছেন, জামাত ও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই, ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনায় বিশ্বাসী তারা। কিন্তু এসবই যে মিথ্যা তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। ফলে, হেভিওয়েট প্রার্থী হয়ে নির্বাচনের মাঠে যাওয়ার সুযোগ হারাল তারা।

চতুর্থত, তারেকের উপস্থিতির ফলে বিএনপির নির্বাচনী কৌশল হবে আত্নরক্ষামূলক। এখন বিএনপিকে ২০০১ থেকে ২০০৬ এর অপকর্মের জবাবদিহি করতে হবে। এরফলে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, হাওয়া ভবনের দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং, সিএনজি দুর্নীতিসহ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মতো অপকর্মগুলোকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রশ্নগুলো যে ছিল আবার নতুন করে সামনে চলে আসলো।

পঞ্চমত, খালেদা জিয়ার ৭ই ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারের পর থেকে বিএনপির যেসব সিনিয়র নেতারা বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং বিএনপিকে জামাতের ছায়া থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছিল তারা কোণঠাসা হয়ে পড়বে। এসব সিনিয়র নেতারা তারেকের অশালীন ও খারাপ আচরণের বিষয়ে আগে থেকে অবগত। এই নেতারা নির্বাচনের মাঠে দলের পাশে কতটা তৎপর থাকবেন তা এখন দেখার বিষয়।

নির্বাচনের আগে হঠাৎ করেই তারেক জিয়ার এমন সামনে আসার ফলে হয়তো বিএনপির একাংশের লাভ হলো, কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিএনপি যে নতুন রাজনীতির কথা বলে আসছিল, তা শুধুই কথার বুলি হিসেবে উপস্থাপিত হলো। এতে, ভোটের বাক্সে হয়তো তাদের পক্ষের ভোটগুলোই পড়বে কিন্তু দলটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সাধারণ জনগণ।

বাংলা ইনসাইডার

আপনি দেখেছেন কি?

মহাজোটের আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের শরিকদের আসন নিশ্চিত করে চিঠি দিতে শুরু করছে আওয়ামী …