fbpx

বাংলাদেশে গৃহকর্মী: সাপ্তাহিক ছুটি? ঈদের ছুটি? সেটা আবার কী জিনিস?

রোকেয়া লিটা:

আজকাল বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অন-ডিমান্ড গৃহকর্মী সরবরাহ করছে এবং নিজেদের প্রচারণার জন্য নানা ধরণের নজরকাড়া বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গৃহকর্মী সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞাপন আমার চোখে পড়েছে। সে বিজ্ঞাপনে একটি বাক্য ব্যবহার করা হয়, “ম্যাডাম একদিন আসে তো দশ দিন আসে না?”

অর্থাৎ গৃহকর্মীকেই এখানে ম্যাডাম হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। তা বেশ, কিন্তু একদিন আসে তো দশদিন আসে না, মানে দাঁড়ায় গৃহকর্মীরা দশদিন পরপর একদিন করে কাজ করতে আসে! গৃহকর্মীদের ফাঁকি দেয়ার কথা হরহামেশাই শোনা যায়, বিশেষ করে না জানিয়ে ছুটি নেয়ার বিষয়টি ভীষণ বিরক্তিকর। গৃহকর্তাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বললে সবার আগে তাদের ফাঁকি দেয়ার বিষয়টিই আলোচনায় প্রাধান্য পায়।

সিঙ্গাপুর গৃহকর্মী সাপ্তাহিক ছুটি বাদেও সরকারি ছুটির দিনগুলোতে ছুটি পায়।

তাই বলে, দশদিন ফাঁকি দেয়ার পর একদিন কাজে আসার কথা তো কোথাও শোনা যায় না। হ্যাঁ, দশ দিন পরপর হয়তো একদিন করে ফাঁকি দেয় তারা এবং এ নিয়ে গৃহকর্তাদের অসন্তোষের শেষ নেই। এটা ঠিক যে, আমাদের দেশে গৃহকর্মীরা যে কাজগুলো করে সেগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ যেমন ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, বাসন মাজা, রুটি বানানো, কারো কারো বাসায় রান্না করা বা বাচ্চার দেখাশোনাও গৃহকর্মী করে থাকে। কাজেই একদিন ফাঁকি দিলেই গৃহকর্তার খবর হয়ে যায়।

তাই বলে, আপনার বাসায় যে গৃহকর্মী রয়েছে তার কোনোদিন মাথাব্যথা ও জ্বর হবে না বা ডায়রিয়া হবে না, সে কখনও দাঁতের ব্যথায় কাত হয়ে পড়বে না, তার কখনও জরুরি কাজ পড়বে না, তার বাচ্চার কখনও অসুখ হবে না, বা একটানা ৫/৬ দিন কাজ করার পরে সপ্তাহে একদিন তার পরিবারের সাথে সময় কাটাতে মন চাইবে না – এমনটি আশা করা কি ঠিক?

ঠিক তো না-ই, রীতিমত অমানবিক।

সে তো আর যন্ত্র নয়, সে তো মানুষ। এমনকি যন্ত্রও একটানা চলতে থাকলে হ্যাং হয়ে যায়, তার বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। তাহলে একটানা কাজ করার পরে সপ্তাহে একদিন করে ছুটি তো গৃহকর্মীরও প্রয়োজন হয়।

কিন্তু আমরা কজন এ বিষয়টা উপলব্ধি করেছি? ভীষণ অধিকার সচেতন ব্যক্তিটিও দেখা যাবে, ঘরে গিয়ে আশা করেন তার বাসার গৃহকর্মী প্রতিদিন আসুক।

সত্যি বলতে কি, গৃহকর্মী ফাঁকি দিলে আমিও প্রথম প্রথম খুব বিরক্ত হতাম। কারণ, আমার বাসায় রান্না থেকে শুরু করে ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া সবই গৃহকর্মীকে দিয়ে করাতে হয়। কাজেই সে একদিন ফাঁকি দিলেই আমি বেশ সমস্যায় পড়ে যাই।

কিন্তু তার ছুটিও তো দরকার। এ বিষয়টি যখন উপলব্ধি করলাম, তখন থেকে যে কাজগুলো একজনকে দিয়ে করাতাম, তা করার জন্য দু’জন রাখলাম। উদ্দেশ্য একটাই – একজন ছুটি নিলে আরেকজন যেন তার কাজটা করে দিতে পারে এবং আমার কোনো সমস্যা না হয়।

আমারও উৎসাহ বেড়ে গেল, আমি তাদেরকে বললাম যে তারা চাইলে এভাবে সপ্তাহে একদিন করে ছুটিও নিতে পারে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হলো না।

কারণ, এরা একসাথে অনেকগুলো বাসায় কাজ করে। দেখা গেল, আমার বাসায় সকাল আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত কাজ করে, দশটা থেকে বারোটা আরেক বাসায় এবং বারোটা থেকে দুইটা অন্য আরেক বাসায় কাজ করে তারা।

কাজেই আমি সাপ্তাহিক ছুটি দিলেও লাভ নেই, অন্য বাসাগুলোতে তারা ছুটি পাচ্ছে না। ফলে তাদেরকে প্রতিদিনই ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে এবং কাজও করতে হচ্ছে।

এ তো গেল সাপ্তাহিক ছুটির কথা, কোনো কোনো বাসায় গৃহকর্মীরা ঈদের ছুটিও পায় না। আমার বাসায় যে দুজন কাজ করে, তাদের একজন ঈদের পরে ছুটিতে গেল, আরেকজন ছুটিই নিলো না। কারণ, সে আমার বাসা ছাড়াও অন্য আরেকটি বাসায় কাজ করে, সেখানে তার ঈদের দিনেও কোনো ছুটি ছিল না।

ঈদের পরদিন মেয়েটি কাজে এলে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ঈদ কেমন কাটলো। উত্তরে সে জানালো, ঈদের দিন সকালে তার দুটি শিশু সন্তানের জন্য খাবার রান্না করেই সাড়ে দশটায় ওই বাসায় কাজ করতে যায়। সে বাসার গৃহকর্তা তাকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত কাজ করিয়ে নিয়ে যাবার সময় হাতে কিছু খাবার ধরিয়ে দেয়।

ঘরে গিয়ে সেই খাবার তার সন্তান দুটিকে খাইয়ে আবার নিজেদের জন্য রান্না বসায় মেয়েটি। সেই রান্না শেষ হতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। তারপর মেয়েটির পরিবারের লোকজনের কপালে খাবার জুটলো। এই হলো, এক গৃহকর্মীর ঈদ উদযাপন!

আপনি যদি এভাবে ভেবে থাকেন যে, “ঈদের দিনে তাকে এত খাটিয়ে নিয়েছি তো কী হয়েছে, আমি তো তাকে অনেকগুলো খাবার দিয়েছি, তার আর বাসায় গিয়ে রান্নার দরকার নেই”, তাহলে নিশ্চিত থাকুন ঈদ আনন্দ কী জিনিস সেটাই আপনি বোঝেন না।

খাওয়া পেলেই তো আর আনন্দ হয় না, উৎসবে নিজের ঘরে রান্না করতে যাওয়া, পরিবারের সাথে সময় কাটানোটাও আনন্দের।

যারা ঈদ উৎসবেই ছুটি পায় না, সরকারি ছুটির দিনগুলোতে তারা ছুটি পাবে এমনটি আশা করা তো দূরের কথা।

আমি সিঙ্গাপুরে দেড় বছর বাস করেছি, দেখেছি গৃহকর্মীদের কীভাবে ছুটি দেয় গৃহকর্তারা। আমরা যে বাসায় ভাড়া থাকতাম, সে বাসায় সপ্তাহে দুদিন বাড়িওয়ালাই গৃহকর্মী পাঠাতো।

সাপ্তাহিক ছুটি বাদেও সরকারি ছুটির দিনগুলোতে আমাদের বাসার গৃহকর্মী ছুটি পেত এবং এটা আগেই আমাদের বাড়িওয়ালা জানিয়ে দিত। এছাড়া অতিরিক্ত কর্ম ঘন্টার জন্য আলাদা পারিশ্রমিক তো পেতই। আর আমাদের দেশে কী হয়?

ধরুন আপনার গৃহকর্মীকে রেখেছেন ঘর মোছা আর কাপড় ধোয়ার জন্য, দেখা গেল দুদিন পরপরই আপনি বলছেন কাপড়গুলো একটু ভাঁজ করে দিয়ে যাও বা গোসলখানাটা একটু পরিষ্কার করে দাও। আপনি তাকে দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করিয়ে নিচ্ছেন ঠিকই, অতিরিক্ত পারিশ্রমিক কি দিচ্ছেন? কয়জন অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে থাকি আমরা? সন্দেহ আছে আমার।

কথায় কথায় আমরা পোশাক কারখানার মালিকদেরও সমালোচনা করি যে, তারা ঠিক মতো বেতন-বোনাস দেয় না। আমার বা আপনার বাসায় যখন দুজন গৃহকর্মী কাজ করছে, তখন আমরাও চাকরিদাতা।

আমরা নিজেরা তাদের অধিকারের ব্যাপারে কতটা সচেতন? আসুন আত্মসমালোচনা করি।

লেখক-সাংবাদিক, সিঙ্গাপুর

আপনি দেখেছেন কি?

শেখ হাসিনার নতুন চমক কী!

সায়েদুল আরেফিন: দেশ সেবার জন্যই রাজনীতিকগণ রাজনীতি করেন বলে দাবি করেন দুনিয়াজুড়ে। তাইতো তো তাঁদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *