যে কারণে বিচার নিজেদের হাতে তুলে নিল জনতা

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে সুরুজ আলী (৪০) নামে এক ভ্যানচালককে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত রবিউল ইসলাম (৩২) নামে আরেকজনকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। বৃহস্পতিবার উপজেলার বীরগঞ্জ পৌরসভার জেলখানা মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত সুরুজ আলী ওই এলাকার কাশেম আলীর ছেলে এবং রবিউল একই এলাকার তারা মিয়ার ছেলে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বৃহস্পতিবার ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে ফেরার পথে সুরুজ আলীকে গলা কেটে হত্যা, মুরগির খামারের নৈশপ্রহরী শহীদ ও তার ৩ বছরের ছেলে একরামুলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে পালিয়ে যায় একই এলাকার সন্ত্রাসী রবিউল ইসলাম।

এটি জানতে পেরে বীরগঞ্জের স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ভোর ৫টা থেকে গাছ কেটে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে হাজার হাজার লোক। বিক্ষুব্ধ লোকজন জেলখানা মোড় এলাকায় রবিউল ইসলামের বাড়িতে রক্তমাখা কাপড় দেখতে পেয়ে তাকে খুঁজতে থাকে।

সকাল ৮টায় তাকে কাহারোল উপজেলার ১৩ মাইল গড়েয়া নামক স্থানে খুঁজে পায়। বিক্ষুব্ধ লোকজন রবিউলকে ধরে নিয়ে বীরগঞ্জ শালবাগান মোড়ে এনে পেটাতে থাকে। একপর্যায়ে তারা নির্মাণাধীন রাস্তার পিচ তার গায়ে ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ফলে আগুনে পুড়ে রবিউলের মৃত্যু হয়।

পরে তারা রবিউলের বাড়িঘর ভেঙে দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

ঘটনাস্থল থেকে রবিউলের মা রোসনা বেগম ও বোন সুলতানা খাতুনকে আটক করে বীরগঞ্জ থানা পুলিশ।

বীরগঞ্জ থানার ওসি শাকিলা পারভীন জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন জানান, যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তার সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিহতদের দাফনের জন্য সরকারি অনুদান এবং চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।

এদিকে বীরগঞ্জ শালবাগান মোড়ে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষের উপস্থিতিতে রবিউলকে যখন পুড়িয়ে মারা হয়, তখন তার প্রতি কারো সহানুভূতি লক্ষ করা যায়নি। বরং এ সময় কেউ কেউ উল্লাস প্রকাশ করে।

এর কারণ হিসেবে জানা যায়, বীরগঞ্জ এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন থেকেই তার ওপর ক্ষুব্ধ। গত প্রায় ২ মাস আগে সুরুজ আলীর ভাতিজা বশিরকে হত্যা করে বলে অভিযোগে জানা যায়।

কিন্তু ভয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করেনি বশিরের পরিবার। গত সোমবারও একজনকে এলোপাতাড়ি কোপায় সে।

বীরগঞ্জ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজউদ্দিন জানান, রবিউল ইসলাম খারাপ প্রকৃতির ছেলে ছিল। এর আগেও তার বিরুদ্ধে মানুষকে কোপানো, স্কুলগামী ছাত্রীদের গায়ে হাত দেয়াসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হলেও তার বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মো. নুর ইসলাম জানান, গত ৬ আগস্ট স্থানীয় একজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর প্রেক্ষিতে রবিউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে স্থানীয়রা। প্রথমে স্থানীয়রা স্থানীয় সাংসদ মনোরঞ্জন শীল গোপালের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে।

এরপর বীরগঞ্জ থানার ওসি শাকিলা পারভীনের কাছে অভিযোগ করা হলে তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। ইউএনওর ভ্রাম্যমাণ আদালতে রবিউলকে সাজা দেয়ার কথা বলা হলেও তারা সাজা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বীরগঞ্জ থানার ওসি শাকিলা পারভীন জানান, রবিউলের বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ করেছে, তারা মৌখিক অভিযোগ করেছে। লিখিত অভিযোগ না করায় তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারেননি।

তার বিরুদ্ধে আর কোন মামলা আছে কিনা, তা জানাতে পারেননি ওসি শাকিলা পারভীন। তবে ওসি জানান, রবিউল একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ।

বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন জানান, রবিউলের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র আমার কাছে নয়, স্থানীয় সাংসদ, পুলিশ সুপার ও বীরগঞ্জ থানায় অভিযোগ করেছিল স্থানীয়রা।

তাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেয়ার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশের বিষয়ে ইএনও মো. তোফাজ্জল হোসেন জানান, রবিউলের যে অপরাধ তা ভ্রাম্যমাণ আদালতের আওতায় পড়ে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE