fbpx

সাহাবীদের পরিচয়, সংখ্যা ও মর্যাদা

মাওলানা মিরাজ রহমান: ‘সাহাবী’ একটি আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ সঙ্গী, সাথী। পরিভাষায় সাহাবী বলা হয়, যারা ঈমান অবস্থায় নবী করীম (সা.) -এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং মুমিন অবস্থাতেই ইন্তেকাল করেছেন তাদেরকেই ‘সাহাবী’ বলা হয়। (কাওয়াইদুল ফিকহ, সাইয়েদ মুফতি মুহাম্মাদ আমীমুল এহসান, পৃষ্ঠা-৩৪৬)

সাহাবীগণের সংখ্যা লক্ষাধিক। নবী-রাসূরগণের পরই তাদের মর্যাদা। কুরআন ও হাদিসে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। তারা আল্লাহ তাআলার মনোনীত জামাআত বা কাফেলা। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, তারপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করলাম। (সূরা ফাতিরা, ৩৫ :৩২)

এক হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ্ তাআলা নবী-রাসূলগণের পর সমস্ত বিশ্ব ভূ-ম-লে আমার সাহাবীগণকে মনোনীত করেছেন। (মুসনাদে বাযযার, সূত্র : মাকামে সাহাবী, পৃষ্ঠ-৬০, মুফতি মুহাম্মাদ শফী রহ.; আল জামি লি আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতবী, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠ-১৯৬)

পবিত্র কুরআনের আলোকে সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদা: সাহাবায়ে কিরামের শিক্ষক হলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)। তিনি তালিম, তারবিয়্যাত, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, ইসলাহ্ ও সংশোধনের মাধ্যমে তাদেরকে যোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের সত্যবাদিতা, নির্ভরযোগ্যতা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার প্রশংসা করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল, তার সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির কামনায় তুমি তাদেরকে রূকূ ও সিজ্দায় অবনত দেখবে। তাদের মুখমন্ডলে সিজদার প্রভাব পরিস্ফুট থাকবে। (সূরা ফাতাহ, ৪৮ : ২৯)

ইমাম কুরতবীসহ (র.) সকল মুফাসসিরগণ আয়াতে উল্লেখিত (আল্লাহি মায়াহু) অংশটিকে আম বা ব্যাপক অর্থবোদক বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক সাহাবীই এ আয়াতের মর্মার্থের অন্তর্ভুক্ত। (মাকামে সাহাবী, পৃষ্ঠ-৪০, মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.); আল জামি লি আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতবী, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠ-১৯২)

সাহাবায়ে কিরামের জামাআত আদর্শ জামাআত। তাদের অনুসৃত পথ সঠিক বা নির্ভুল পথ। এ কারণেই তাদের বিরোধিতা করাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) -এর বিরোধিতার নামান্তর বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং এ জাতীয় লোকদেরকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে বলে সতর্ক করা হযেছে। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের (সা.) বিরুদ্ধাচারণ করে আর মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে তবে যেদিক সে ফিরে যায়, সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দিব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করবো আর তা কত মন্দ আবাস। (সুরা নিসা, ৪ : ১১৫)

এই আয়াতে মুমিন বলতে সাহাবা আজমাইনদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে। কারণ তারাই মুমিনদের সর্বপ্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জামাআত। এর দ্বারা আরো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সাহাবায়ে কিরামের জীবন, তাদের আমল, আখলাক, চরিত্র ও কার্যধারার অনুসরণই হলো রাসূলুল্ল্হা (সা.) -এর সঠিক অনুসরণ। আর সাহাবায়ে কিরামের জীবন ও চরিত্রকে আদর্শ নমুনা রূপে স্বীকার করে নিলেই তা সম্ভব হতে পারে। আল-কুরআনে আল্লাহ্ তাআলা নিজে তাদের ঈমানের দৃঢ়তা এবং পাপাচার থেকে মুক্ত থাকার আন্তরিক আগ্রহের কথা ঘোষণা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ্ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন, আল কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের নিকট অপ্রিয়। তারাই সৎপথ অবলম্বনকারী। (সূরা হুজরাত ৪৯ :৭)

এছাড়া সাহাবায়ে কিরামের প্রতি আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টির কথা উল্লেখ করে আল-কুরআানে ইরাশাদ হয়েছে, আল্লাহ্ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তার প্রতি সন্তুষ্ট। (সূরা বায়্যিনা, ৯৮ : ৮)

মহান আল্লাহ্ যাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন ইনশাআল্লাহ্ তাদের প্রতি কখনো তিনি অসন্তুষ্ট হবেন না। (মাকামে সাহাবী, পৃষ্ঠ-৪৪, মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.); আল ইসতিয়াত, ভূমিকা- আল্লামা ইবন আবদুল বার রহ.) এছাড়াও আরো বহু আয়াতে সাহাবায়ে করামের ফজিলত ও মর্যাদা সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

হাদিসের আলোকে সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদা: অনেক হাদিসে সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদার কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, রিসালাতের জন্য আল্লাহ্ আমাকে নির্বাচন করেছেন এবং আমার সাহচর্যের জন্য সাহাবাদের নির্বাচন করেছেন। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ব্যক্তিকে আমার উজির, কতিপয়কে আমার জামাতা ও শ্বশুর নির্বাচন করেছেন। যারা তাদেরকে মন্দ বলবে তাদের উপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও মানবকুলের লানত নেমে আসবে। তাদের ফরজ ও নফল কোনো আমলই কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাআলা কবুল করবেন না। (মাকামে সাহাবী, পৃষ্ঠ-৬০, মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.); আল জামি লি আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতবী, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠ-১৯৬)

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাস্ঊদ (রা.) সাহাবায়ে কিরামের অতীব সম্মান ও মর্যাদার কথা উল্লেখপূর্বক বলেন, কেউ যদি কারো আদর্শ অনুসরণ করতে চায় তাহলে তার জন্য উচিত যারা ইন্তেকাল করেছেন (সাহাবী) তাদের আদর্শ অনুসরণ করা। কেননা জীবিত ব্যক্তি ফিতনার সম্ভাবনা থেকে মুক্ত নয়। আর তারা হলেন মুহাম্মদ (সা.) -এর সাহাবী। হৃদয়ের পবিত্রতায়, ইলমের গভীরতায় এবং আড়ম্বরহীনতায় তারা ছিলেন এই উম্মতের শ্রেষ্ঠতম জামাআত। আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে তার নবীর সঙ্গলাভ এবং দীন প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নাও, তাদের পথ-পন্থা অনুসরণ করো এবং তাদের আখলাক ও আদর্শ দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরো। তারা ছিলেন সরল ও সঠিক পথের পথিক। (মুসনাদে রযীন, সূত্র : মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠ-৩২)

উম্মাতের শ্রেষ্ঠতম কোনো ব্যক্তির বড় থেকে বড় কোনো নেক আমলও সর্বনিম্ন সাহাবীর ছোট হতে ছোট কোনো আমলের সমতুল্য হতে পারে না। সুতরাং তাদেরকে গালমন্দ করার অধিকার কারও নেই। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, তোমরা সাহাবাদের গালমন্দ করো না। কেননা আল্লাহর পথে তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ দান করেও কোনো সাহাবীর কোনো মুদ (প্রায় এক সের) বা তার অর্ধেকের সমতুল্য হবে না। (বুখারী ও মুসলিম, সূত্র : মিশকাত শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠ-৫৫৩)

সাহবীকে ভালবাসার অর্থ রাসূলুল্লাহকে (সা.) ভালবাসা। তাদের সম্বন্ধে সামান্যতম কটুবাক্যও গুরুতর ধৃষ্টতা। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেন, আমার সাহাবীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে বিশেষভাবে ভয় করো। আমার পর তোমরা তাদেরকে সমালোচনার লক্ষ্যস্থল বানিও না। তাদের প্রতি ভালবাসা আমার প্রতি ভালবাসারই প্রমাণ এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষ আমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণেরই প্রমাণ। তাদেরকে যে কষ্ট দিলো, সে আমাকেই কষ্ট দিলো। আর যে আমাকে কষ্ট দিলো সে আল্লাহকে কষ্ট দিলো। আর যে আল্লাহকে কষ্ট দিলো, অতিসত্বর তিনি তাকে পাকড়াও করবেন। (তিরমিযী, সূত্র: মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠ-৫৫৪)

সুতরাং যারা সাহাবীগণের দোষ খুঁজে বেড়ায় এবং তাদের সমালোচনা করে তারা অভিশপ্ত। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আরো ইরশাদ করেন, কাউকে আমার সাহাবীদের মন্দ করতে যদি দেখ; তাকে বলে দিবে তোমাদের মধ্যে যারা নিকৃষ্টতর তাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। (তিরমিযী, সূত্র : মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠ-৫৫৪)

সাহাবীগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা অপরিহার্য। এই মর্মে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, তোমরা আমার সাহাবীদের সম্মান করবে। কেননা তারা তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। (শিশকাত, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠ-৫৫৪)

নবী (সা.) তাদের প্রশংসায় আরো ইরশাদ করেছেন, জাহান্নামের আগুন ঐ মুসলিম ব্যক্তিকে স্পর্শ করবে না, যে আমাকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। (প্রাগুক্ত)

পরিশেষ- উপরোক্ত আয়াত এবং হাদিসের মধ্যে সাহাবায়ে কিরামের প্রশংসা, ফজিলত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত প্রাপ্তির সুসংবাদের পাশাপাশি উম্মাতকে তাদের অনুসৃত পথে চলার প্রতি গুরুত্বের কথা সহজেই অনুমেয়। একই সাথে হুশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে সাহাবীদের প্রতি দোষারোপ করার কঠিন পরিণতি সম্পর্কেও। সর্বোপরি সাহাবায়ে কিরামের প্রতি ভালবাসাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) -এর ভালবাসার এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষকে রাসূলুল্লাহ্ (স.) -এর প্রতি বিদ্বেষের পরিচায়ক বা প্রমাণ ঘোষণা করা হয়েছে।

আপনি দেখেছেন কি?

কীভাবে বুঝবেন আল্লাহ আপনার প্রতি সন্তুষ্ট কি না?

আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ের একান্ত চাওয়া। কিন্তু কীভাবে বুঝবেন আপনি আল্লাহ তায়ালা আপনার ওপর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *